Follow by Email

Search This Blog

Loading...

Wednesday, 18 January 2012

একজন ভাগীরথী এবং অজ্ঞাতনামা রাজাকার

"অষ্টাদশী ভাগীরথী ছিল বরিশাল জেলার পিরোজপুর থানার বাঘমারা কদমতলীর এক বিধবা পল্লীবালা। বিয়ের এক বছর পর একটি পুত্র সন্তান কোলে নিয়েই তাকে বরণ করে নিতে হয় সুকঠিন বৈধব্য। স্বামীর বিয়োগ ব্যথা তার তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নেমে এল ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। গত মে মাসের এক বিকালে ওরা চড়াও হলো ভাগীরথীদের গ্রামে। হত্যা করলো অনেককে যাকে যেখানে যেভাবে পেলো।

এ নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ভাগীরথীকে ওরা মারতে পারলো না। ওর দেহলাবণ্য দস্যুদের মনে যে লালসা জাগিয়েছিল তাতেই হার মানল তাদের রক্ত পিপাসা। ওকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এল পিরোজপুরে। তারপর ক্যাম্পে তার উপর চালানো হলো হিংস্র পাশবিক অত্যাচার।

সতী নারী ভাগীরথী। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে তিনি একমাত্র পরিত্রাণের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এল নতুন চিন্তা- হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরণ করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেব কেন? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিল এবার।
এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয় দস্তরমত খানদের খুশী করতে শুরু করল, ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগলো। বেশীদিন লাগলো না, অল্প কদিনেই নারী লোলুপ ইয়াহিয়া বাহিনী ওর প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করল। আর এই সুযোগে ভাগীরথী ওদের কাছে থেকে জেনে নিতে শুরু করল পাক বাহিনীর সব গোপন তথ্য। এক পর্যায়ে বিশ্বাস ভাজন ভাগীরথীকে ওরা নিজের ঘরেও যেতে দিল। আর কোন বাঁধা নেই। ভাগীরথী এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যায় আবার ফিরে আসে নিজ গ্রামে।


এরই মধ্যে চতুরা ভাগীরথী তাঁর মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেল অনেকখানি। গোপনে মুক্তি বাহিনীর সাথে গড়ে তুলল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এরপরই এল আসল সুযোগ। জুন মাসের একদিন ভাগীরথী খান সেনাদের নিমন্ত্রণ করলো তাঁর নিজ গ্রামে।
এদিকে মুক্তি বাহিনীকেও তৈরী রাখা হলো যথারীতি। ৪৫ জন খান সেনা হাসতে হাসতে বাগমার কদমতলা (ভাগীরথীর) নিমন্ত্রণ খেতে এসেছিল কিন্তু তার মধ্যে ৪/৫ জন ক্যাম্পে ফিরতে পেরেছে বুলেটের ক্ষত নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে। বাকিরা ভাগীরথীর গ্রামেই শিয়াল কুকুরের খোরাক হয়েছে।


এরপর আর ভাগীরথী ওদের ক্যাম্পে যায়নি। ওরাও বুঝেছে, এটা তারই কীর্তি। পাক আর্মিরা তাই হুকুম দিল জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে যে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে নগত এক হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। কিন্ত ভাগীরথী তখনও জানতো না ওর জন্য আরও দুঃসহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লো ভাগীরথী। তাকে নিয়ে এল পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে।

খান সেনারা এবার ভাগীরথীর উপর তাদের হিংস্রতার পরীক্ষার আয়োজন করলো। এক হাটবারে তাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হলো জনবহুল চৌমাথায়। সেখানে প্রকাশ্যে তার অঙ্গাবরণ খুলে ফেলল কয়েকজন খান সেনা। তারপর দু’গাছি দড়ি ওর দু’পায়ে বেঁধে একটি জীপে বেঁধে জ্যান্ত শহরের রাস্তায় টেনে বেড়াল ওরা মহাউৎসবে।

ঘন্টাখানেক রাজপথ পরিক্রমার পর আবার যখন ফিরে এল সেই চৌমাথায় তখনও ওর দেহে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে। এবার তারা দুটি পা দুটি জীপের সাথে বেঁধে নিল এবং জীপ দুটিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে। ভাগীরথী দুভাগ হয়ে গেল।

সেই দুভাগে দু'জীপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এল সেই চৌমাথায় এবং এখানেই ফেলে রেখে গেল ওর বিকৃত মাংসগুলো। একদিন দু’দিন করে সে মাংসগুলো ঐ রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়। বাংলামায়ের ভাগীরথী এমনি ভাবে আবার মিশে গেল বাংলার ধুলিকণার সাথে…।"
সূত্র: বর্বরতার রেকর্ড, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড (ভাষারীতি অবিকল রাখা হয়েছে)।

আমাদের দেশে ভাগিরথীদের মত মানুষদের আত্মত্যাগের কথা জানতে আমরা খুব একটা আগ্রহ বোধ করি না, মিডিয়াও না। এই দেশে স্বাধীন করে ফেলেছেন এমন গুটিকয়েক নাম বলে বলে সময় কোথায় আমাদের!
ভাগীরথীর সম্বন্ধে আমি জানতে পারি সম্ভবত ২০০৫ সালে। ২০০৬ সালে এই লেখাটা যখন আমি আমার কয়েদী বইয়ে উল্লেখ করেছিলাম তখন আমার বিপুল তথ্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিশেষ তথ্য হাতে ছিল না। এখনকার মত কয়েক বছর পূর্বেও ব্লগস্ফিয়ারে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তেমন উল্লেখ করার মত তথ্য ছিল না।
এই এক অভাগা দেশ, এখানে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বইপত্রের দাম সুলভে থাকাটা যুক্তিযুক্ত অথচ একেকটা বইয়ের দাম আগুনসম।

আমার মনে আছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের এবং অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত বইপত্রের প্রায় পনেরো হাজার ফটোকপি করেছিলাম। উপায় ছিল না। নৈতিকতা-অনৈতকতা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় তখন আমার ছিল না। আগেই উল্লেখ করেছি, ব্লগস্ফিয়ারে তখন তেমন কোনো তথ্যই ছিল না, অন্তত বাংলা ভাষায়।
তো, গতকাল আমার মাথায় বিষয়টা আসে, ভাগিরথীকে রাজাকাররা ধরিয়ে দিয়েছিল, বেশ। কিন্তু আমরা কোথাও এই রাজাকারের নাম জানতে পাই না। কারণ আছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের পর সঠিক ইতিহাসের কাজ শুরু হয়েছিল বটে কিন্তু পরে আর এগুতে পারেনি! তাছাড়া ওই সময় হয়তো এই রাজাকারদের নাম নিয়ে আসার বিষয়ে কেউ তেমন করে ভাবেননি।
এমন কি আমি নির্বোধের মাথায়ও কখনও আসেনি ভাগিরথীকে যারা ধরিয়ে দিয়েছিল, ওই রাজাকার কে-কারা ছিল। এই নিয়ে এখন নিজের প্রতিও আমার ক্ষোভ আছে। কেন বিষয়টা পূর্বে আমি লক্ষ করলাম না!

ভাগিরথীর ঘটনাটা পিরোজপুরে। যুদ্ধের সময় পিরোজপুরেই ছিলেন অতি সজ্জন (!) এক ব্যক্তি যিনি রাজাকারের সর্দার হিসাবে যথেষ্ঠ কুখ্যাত ছিলেন। আমরা সবাই জানি (কেবল আসিফ নজরুল ব্যতীত) তিনি হচ্ছেন, আমাদের মহান মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এহেন কোনো অপকর্ম নাই যা তিনি করেননি। ভাগিরথীকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ১০০০ (তৎকালীন হিসাবে বিপুল টাকা) টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করা হবে আর মাওলানা সাহেব ঝিম মেরে বসে থাকবেন এ আমার বিশ্বাস হয় না। যে সাঈদী মানুষের ঘরের টিনটা পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে।

আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছি, কোনো এক সূত্রের কল্যাণে বের হয়ে আসবে সেই অজ্ঞাতনামা রাজাকারের নাম...।   

Thursday, 2 June 2011

মজিবর রহমানদের চলে যাওয়ার অপেক্ষায়

Gulzar Hossain Ujjal, চমৎকার একটি লেখা লিখেছিলেন, 'একজন আউটসাইডার, মজিবর রহমান দেবদাস [১]'।
আমি খানিকটা ভাবনায় ছিলাম এই লেখার পেছনে সূত্র নিয়ে। এর রেশ ধরে দেখা শুরু করলাম, 'কান পেতে রই'। একটি তথ্যচিত্রের মধ্যে যে মুনশিয়ানার ছাপ থাকা প্রয়োজন তার কোন অভাব এর মধ্যে ছিল না- অসাধারণ এক তথ্যচিত্র!
'কান পেতে রই' তথ্যচিত্রটা না-দেখলেই ভাল করতাম কারণ আমার বড়ো কষ্ট হচ্ছিল। কষ্ট হচ্ছিল এই কারণে আমরা যে কত বড়ো অসভ্য, বর্বর এটা নতুন করে জেনে। মানুষখেকো আফ্রিকান কোন এক উপজাতি যখন কাটা মুন্ডু নিয়ে উল্লাস করে তখন আমাদের চোখে সহ্য হয় না। ফালতু, এই সব কোন ছার! আমাদের নিজের কান্ড দেখে আমাদের নিজেরই সহ্য হয় না!

এক লেখায় আমি লিখেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে আমরা এখন একটা পণ্যে পরিণত করেছি [২]। মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়ি খাওয়াটাও আমাদের চোখে একটা পণ্য [৩]। ক-দিন পর আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের কি কি নিয়ে ব্যবসা করব এরও একটা চোথা করা আবশ্যক। এ দেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছেন; ব্যবসা করার জন্য আর কিছু না-পেলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাড়গোড় নিয়ে কোন-না-কোন একটা ব্যবসা করা যাবে নিশ্চিত!

মুক্তিযুদ্ধের অবদানের বিষয়ে গুটিকয়েক মানুষের গল্প বলাই আমাদের শেষ হয় না অন্যদের কথা বলার সময় কোথায় আমাদের। বেইবী, কীসব গল্প! কেউ কেউ তো দেশ স্বাধীন করার কাজে এতো ব্যস্ত থাকতেন ডায়াপার বদলাবার সময়ও পেতেন না!
এই দেশে এন্তার ন্যাতাদের ভিড়ে হারিয়ে যান মশিহুর রহমানের মত মানুষ [৪]। আমাদের সময় কোথায় মশিহুর রহমানদের মত মানুষদের খোঁজ রাখার? মজিবর রহমান দেবদাসের মত মানুষদের বেলায়ও এর ব্যত্যয় হবে কেন!
ঋণ: তথ্যচিত্র, "কান পেতে রই"
ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"


মজিবর রহমানের লেখা চিঠি


ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"
তাঁর লেখা সেই বিখ্যাত চিঠি!

ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"
তাঁর মুক্তির ছাড়পত্র।

ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"
আইনের মাধ্যমে মজিবর রহমানের নাম পরিবর্তন।

ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"
 বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মজিবর রহমানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ!

ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"
১৯৯৮ সালে জাদুঘরে মজিবর রহমানের স্বহস্তে লেখা মন্তব্য।

আমরা জীবিত মানুষদের সম্মান দেয়া শিখিনি, অপেক্ষায় থাকি তাঁদের মৃত্যুর! একজন মজিবর রহমান হেঁটে হেঁটে চলে যান। আমরা তাঁর চলে যাওয়া দেখি এবং অপেক্ষা করি...
ছবি ঋণ: "কান পেতে রই"

সহায়ক সূত্র:
১. একজন আউটসাইডার...: http://www.ali-mahmed.com/2011/05/blog-post_26.html
২. মুক্তিযুদ্ধের আবেগ...পণ্য: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html
৩. মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়ি: http://www.ali-mahmed.com/2010/12/blog-post_21.html
৪. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html

Wednesday, 20 April 2011

মুক্তিযুদ্ধে, একজন ট্যাংক-মানব!



এম এ জব্বার।

মানুষটা আমার জন্য অসাধারণ এক উপহার নিয়ে এসেছেন। ১৯৭১ সালের গুলির বাক্স। (আমার জীবনে এমনিতেই জটিলতার শেষ নাই। তাই জটিলতা এড়াবার জন্য আমাদের দেশের চৌকশ গোয়েন্দাদের আগাম বলে রাখি, এই গুলির বাক্সটা খালি।)

এমন একজন মানুষ এসেছেন এই আনন্দ রাখি কোথায়! মন্ত্রী-ফন্ত্রী কোন ছার। অনেকে ভ্রু জোড়া দিয়ে বলবেন, তোমার এখানে কোন মন্ত্রী পেশাব করতেও আসবেন না। তাঁদেরকে সবিনয়ে বলি, মন্ত্রীদের পেশাব করার সুব্যবস্থা আমার এখানে নাই।

১৯৭১ সালে এই মানুষটা পাকিস্তান থেকে
আস্ত একটা রাশিয়ান T-55 ট্যাংক নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। জিটি রোড, ওয়াগা সেক্টরে মাইলের পর মাইল ট্যাংক চালিয়ে পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সীমান্তে চলে এসেছিলেন। কী এক পাগলামী, কী অকল্পনীয় এক কান্ড!
ভারতীয় সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করার পর চলে বিরামহীন জিজ্ঞাসাবাদ- মানুষটা কি পাকিস্তানী চর? ভারতীয় সেনার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ঝাপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।

মানুষটা বলে যাচ্ছেন। আমি শ্বাস আটকে শুনি সেইসব আগুন দিনের কথা, তাঁর অসম সাহসীকতার কথা। কতশত অজানা কথা! আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধা হোমো এরশাদ সাহেবের বীরত্বের কাহিনী। তিনি এবং রওশন এরশাদ তখন পাকিস্তানে। ওখানে ওনারা উর্দুতে বাতচিত করতেন। যারা পালিয়ে আসার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতেন তাদের প্রতি উষ্মাও প্রকাশ করতেন উর্দুতে, "শালে, তুমলোগ কে লিয়ে আমলোগ কা জিনা হারাম হো যাতা। ইন্ডিয়া তুমলোগ কা দিমাগ ঘুমা দিয়া"।
এরশাদ সাহেবের এইসব বাতচিত বাংলাতে অনুবাদ করলে অনেকটা দাঁড়াবে এমন, শালা, তোমাদের জন্য আমাদের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেছে। ভারত তোমাদের মাথা এলোমেলো করে দিয়েছে।

মানুষটা একজন সুখি মানুষ। তার আছে ভদ্রস্থ জীবন-যাপন করার সুযোগ। শুনে ভালো লাগে। তার গোলায় আছে ধান, পুকুরে মাছ, চলে যায়। তবুও মানুষটার কী এক হাহাকার! তাঁর সাহসীকতার জন্য তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়া হয়েছিল। লিখিতাকারেও আছে কিন্তু পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে চলে গেলে এই বীরপ্রতীক খেতাবটা গেজেটে উঠেনি তদ্বিরের অভাবে। আজ তিনি একজন খেতাববিহীন মানুষ!

তাঁর আক্ষেপ আমার কানে তালা লাগিয়ে দেয়, "কেন আমাকে খেতাবের জন্য তদ্বির করতে হবে? কেন? আমি কি এইজন্য ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে দেশে চলে এসেছিলাম? ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান একটা
T-33 বিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তিনি এই দেশের বীরশ্রেষ্ঠ। তাঁকে আমি স্যালুট করি। আর আমি ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে সফল হই কিন্তু আমাকে তদ্বির না করার অপরাধে একজন খেতাব বিহীন মানুষ হয়ে থাকতে হবে, কেন?"
এইসব ক্ষেত্রে আমি চুপ করে থাকি, আকাশ দেখি। ভুলেও সামনের মানুষটার চোখে চোখ রাখি না।

কারও কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে আমি আগ্রহ বোধ করি না কিন্তু এই মানুষটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, জোর করে আমার 'জীবনটাই যখন নিলামে' বইটায় তাঁর একটা অটোগ্রাফ নিয়েছি।

*বক্তব্যগুলো জনাব এম, এ, জব্বারের নিজস্ব। তাঁর এইসব বক্তব্যর সপক্ষে প্রমাণ এবং সচিত্র-চলমান চিত্র (চালু নাম ভিডিও ক্লিপিংস) আমার কাছে সংরক্ষিত।
**আমার মাথায় নতুন এক ভূত আসন গেড়েছে। এখন থেকে এইসব আগুন-মানুষদের আনন্দ-বেদনা ভিডিও করে রাখব। এঁদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে আমার আয়ু। এ ব্যতীত আমার গতি কী! সুরুয মিয়ার (তাঁর প্রতি সালাম) ওইসব অজানা কথা তখন সেলফোনে ধারণ করে না রাখলে আজ কোথায় পেতাম?
এম, এ, জব্বারকে নিয়ে একটা সিরিজ লেখার ইচ্ছা আছে, দেখা যাক।



*এই মানুষটা প্রতি (জনাব, এম এ জব্বার) খানিকটা সম্মান দেখাবার চেষ্টা করেছিলাম: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_4596.html 

**মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত পোস্ট http://tinyurl.com/37wksnh

Wednesday, 9 February 2011

আমি সমস্ত খুনি-অপরাধীর বিচার চাই

৭১-এর খুনের অপরাধে কতিপয় অভিযুক্তকে বিক্ষিপ্ত আকারে ধরা হয়েছে। এতে আমার আলাদা কোন উল্লাস নাই। কে ৭১-এ খুন করেছে, কে ৮১-তে, কে ৯১-এ, কে ২০০১ সালে, কে ২০১১ সালে এটা আমার কাছে মুখ্য না। আইন যদি তার নিজস্ব গতিতে চলত তাহলে যথাসময়ে এই সব অন্যায়ের বিচার হত, যুগের পর যুগ ধরে রক্তের দাগ হাতে নিয়ে আমাদেরকে ঘুরে বেড়াতে হত না!
যাই হোক, আমি সমস্ত খুনি-অপরাধীর বিচার চাই। কে কয়টা খুন করেছে সেটা অন্য বিচার্য বিষয়।

৭১-এর খুনি-অপরাধীদের বিষয়টা অনেকখানি ভিন্ন কারণ এরা কেবল অপরাধ করেই ক্ষান্ত থাকেননি যথানিয়মে ক্ষমতায় এসেছেন, আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমাদের মাথায় বনবন করে ছড়ি ঘুরিয়েছেন। সেই কারণে আমাদের ঘৃণাটা তীব্র। এই দেশের আইন এখনও এটা প্রমাণ করতে পারেনি, আইন সবার ক্ষেত্রে সমান। এমনটা হলে বিস্তর প্রমাণ থাকার পরও ৭১-এর খুনিরা সদর্পে ঘুরে বেড়াতে পারত না। কিন্তু এমন বুক চিতিয়ে অনেক খুনিই তো বহাল তবিয়তে আছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে, আইন তাদের কেশও স্পর্শ করতে পারছে না!

কর্নেল তাহেরকে [১] বিচারের প্রহসনের নামে যেমন করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে এটা কি খুন না? এই খুনিরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে গেছেন। এই খুনের বিচার হলো না কেন? একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা [২], একজন সেক্টর কমান্ডার, একজন শারিরীক সমস্যা আক্রান্ত মানুষকে যেভাবে খুন করা হয়েছে এর নজির বিরল! 
তাঁকে যেভাবে ফাঁসি দেয়া হয় প্রকারন্তরে এ খুনেরই নামান্তর। তাঁর ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যু করার মাত্র ৩ দিনের মাথায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অথচ জেল কোড অনুযায়ী ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যুর ২১ দিন আগে বা ২৮ দিন পরে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বিধান নাই। 

শাহআলম সাহেবের সুযোগ্য পুত্র সানবীর কেবল খুনের অভিযোগে অভিযুক্তই না, খুনের মামলায় সানবীরকে ধরতে ইন্টারপোলের সাহায্যও চাওয়া হয়েছিল। ইন্টারপোল এখন ইলেকট্রিক-পোল হয়ে গেছে!
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের পর ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় গোটা পরিবার বিদেশে পালিয়ে যায়। তখন ১৪টি মামলা হয়েছিল।
পট-পরিবর্তনের পর শাহআলম সাহেব কেবল ফিরেই আসেননি, সদর্পে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। টাকা থাকলে কী না সম্ভব [৩]? দান-খয়রাতও করা যায়। শাহআলম সাহেবের সুযোগ্য পুত্রধন এটা না বলে বসে আছেন বুঝি? 'সানবীর' কোন এক ককটেল পার্টিতে রসিয়ে রসিয়ে-তারিয়ে তারিয়ে বলবেন, জানিস, বান...কে মেরে যে গন্ডগোলটা হল না। শ্লা, ড্যাডের ২০০ খরচ হল। কাট মাই শিট!
২০০ মানে ২০০ কোটি।

এক এক করে মিডিয়াও কিনে ফেলা যায় [৪]। সেইসব মিডিয়ায় এই দেশের বুদ্ধিজীবী মানুষরা তাদের বুদ্ধি শাহআলম সাহেবের পদতলে রেখে দেন।  
বেশ, কিন্তু কি গতি হয়েছে সাব্বির হত্যা মামলার? 

রাহেলা [৫] খুনের মামলার এখন অবস্থা কি? এই অভাগা মেয়োট কি বিচার পাবে? মানুষ নামের সেই নৃশংস খুনিরা কি শাস্তি পাবে?
"‘আমি মরি নাই, আমারে বাঁচান’! কেমন করে সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে এই অল্প কটা শব্দ উচ্চারণ করা? যে মানুষটার শরীরে পচন ধরেছে। স্পাইনাল কর্ড এবং দু-পায়ের রগ কাটা, শুধু কন্ঠনালীর মাধ্যমে শরীরের সঙ্গে মাথা ঝুলে আছে। শরীরের ক্ষতঅংশে অজস্র পিপড়া বাসা বেধেছে এবং কাটা অংশ থেকে রক্ত পড়তে পড়তে পুরো শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মানুষটাকে এ গ্রহের চরম শারীরীক নির্যাতন করে নর নামের যে নরপশুরা তাকে জঙ্গলাকীর্ণ নির্জন স্থানে এই অবস্থায় ফেলে গিয়েছিল, দু-দিন পর তার আবার ফিরে আসে এবং জীবিত দেখে ক্ষতস্থানে এসিড ঢেলে দিয়েছিল।" 

বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ সাহেবের আমলে যে ১৪ বছরের বালককে প্রহসনের নামে খুন করা হয়েছিল (দৈনিক আজকের কাগজ, ০৬.০৭.৯১)। ১৪ বছর হলেও আমাদের দেশের প্রচলিত আইন, Sailent features of the children act of 1974, Section 2 (F)-এ বলা হচ্ছে, শিশু কারা? "A child means a person under 16 years of age." ১৬ বছরের নীচে কাউকে ফাঁসি দেয়ার বিষয়ে (Child Rights and Juvenile Justice-এ Section 51), বলা হচ্ছে, "No Child to be sentenced to death." এই শিশু হত্যার কি বিচার হবে না? এই খুনের দায় এরশাদ সাহেব [৬] এড়াতে পারেন কেমন করে? এবং এমন একটা খুন যার কারণে সভ্যতা কেঁপে উঠে!


চলেশ রিছিল নামের মানুষটাকে তৎকালীন এডিএম হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে বলে জানান।কিন্তু আমরা জানি তিনি হৃদরোগে মারা যাননি। তার মৃতদেহে অসংখ্য নির্যাতনের চিহ্ন ছিল, তাঁর চোখের জায়গায় ছিল মার্বেল। ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পথে চলেশ রিছিল এবং তাঁর আত্মীয় প্রতাপ জাম্বিল, তুহিন হাদিমা, পিরেন সিমসাংকে আটক করা হয়। এই প্রতাপ জাম্বিলই জানিয়েছিলেন, আটকের পর তাঁদেরকে মধুপুরের সেনাক্যাম্পে নেয়া হয়। সেখানেই চলেশ মারা যান। খুন নামের এই মৃত্যুর বিচার হবে না?

কল্পনা চাকমা। সেই ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম নির্বাচনের পূর্বে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সেনাসদস্যরা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত যখন কল্পনা চাকমার খোঁজ পাওয়া যায়নি তখন এটাকে খুন হিসাবে ধরে নেয়া যেতে পারে। কেবল তাই না, কল্পনা চাকমা অপহরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রূপন চাকমা নামের একজন ছাত্র নিহত এবং তিনজন ছাত্র নিখোঁজ হন। ওই তিনজন ছাত্রের লাশ আজও পাওয়া যায়নি। এই সব খুনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার হবে না?

১৯৭৫ সালে জেলখানায় যে ৪জন জাতীয় নেতাকে খুন করা হয়েছিল, এই খুনগুলোর বিচার কবে হবে? কোন একটা দেশের সরকার হচ্ছে সেই দেশের জনগণের পিতা। তাঁর দায়িত্ব তার সন্তানদের রক্ষা করা। জেলখানায়, সরকারের কাস্টডিতে যখন ফট করে গুলি করে কাউকে মেরে ফলা হয় তখন কেবল কয়টা প্রাণ গেল সেটা জরুরি না, এই প্রাণগুলো কার ছিল সেটাও এখানে আলোচ্য বিষয় না। স্রেফ একটা সভ্যতার মৃত্যু হয়। মানুষ হিসাবে বর্বর লেন্দু জাতি এবং আমাদের মধ্যে খুব একটা ফারাক থাকে না! 
এখন এই খুনের বিচার হলেও খুব কি একটা লাভ হবে? মোশতাক সাহেব তো সমস্ত শাস্তির বাইরে। কিসের জাস্টিস, কোথায় জাস্টিস! 

এমন কতশত খুনের বিচার হয়নি। তবুও আমি চাইব বিচারগুলো হোক, রক্তের দাগ মুছে যাক। নইলে রক্তের দাগ থেকেই যায় [৮]। সময়টা ৪০ বছর, না ৪০০ বছর, তাতে কী আসে যায়...।

সহায়ক লিংক: 
১. কর্নেল তাহের: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_8805.html 
২. মুক্তিযুদ্ধে একজন তাহের: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5428.html
৩. টাকাই সব: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_14.html
৪. কালের কন্ঠ বনাম মুড়ির ঘন্ট: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_16.html
৫. রাহেলা, একটা চাবুকের নাম: http://www.ali-mahmed.com/2008/02/blog-post_27.html
৬. শিশুর ফাঁসি: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_16.html 
৭. চার নেতা: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_03.html 
৮. রক্তের দাগ: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_18.html