Follow by Email

Search This Blog

Loading...

Friday, 29 June 2007

একাত্তরের দিনগুলি/ জাহানারা ইমাম

(২১ এপ্রিল, বুধবার, ১৯৭১)
আম্মা, দেশের এ অবস্তায় তুমি যদি আমাকে (রুমী) জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইন্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?
…আমি (জাহানারা ইমাম) জোরে দুই চোখ বন্ধ করে বললাম, …ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা।... 


(১লা মে, শনিবার, ১৯৭১)
…পাকিস্তান আর্মি যুবা ও বয়স্ক লোকদের ধরে এনে এখন আর গুলি করে মেরে ফেলছে না, তাদের শরীর থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত রক্ত বের করে তারপর লাশ ফেলে দিচ্ছে। এত রক্ত কেন দরকার হচ্ছে? দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের যে যুদ্ধ হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে, তাতে প্রচুর সংখ্যায় পাকিস্তানী সৈন্য জখম হচ্ছে। তাদের চিকিত্সার জন্য প্রচুর রক্ত দরকার। এত রক্ত ব্লাড ব্যাঙ্কে নেই। তাই এভাবে রক্ত সংগ্রহ করছে। 
(৮ আগস্ট, রবিবার, ১৯৭১)
(মুক্তিযুদ্ধ চলা কালে, রুমী একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে)
…আমার (জাহানারা ইমাম) চোখ পানিতে ভরে গেল। এখন ধরা গলায় বললাম, না, আমার সামনেই খা
(সিগারেট)। অল্প ক-দিনের জন্য এসেছিস। সিগারেট খাওয়ার সময়টুকুও তোকে আড়াল করতে চাই নে। 
(২৪ আগস্ট, মঙ্গলবার, ১৯৭১)
...চেনা হয়ে উঠেছে ডা: জাফরুল্লা চৌধুরী, ডা: এম এ মোবিন। এরা দু’জনে ইংল্যান্ডে এফ. আর. সি. এস পড়ছিল। …বিলেতে চার বছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যখন এফ. আর. সি. এস পরিক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিল, পাকিস্তানী নাগরিকত্ব বর্জন করল…। 


(২৮ আগস্ট, শনিবার, ১৯৭১)
…আমি বললাম, চুপ কর রুমী, চুপ কর…আমার চোখে পানি টলমল করে এল। হাত বাড়িযে রুমির মাথাটা বুকে টেনে বললাম, রুমী। রুমী এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো জানলি না।
রুমী মুখ তুলে কি রকম যেন হাসল। মনে হল অনেক বেদনা সেই হাসিতে। একটু চুপ থেকে বলল, …যদি চলেও যাই কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না।

(২৯ আগস্ট, রবিবার, ১৯৭১)

(ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের নেতৃত্বে পাক আর্মি রুমী, জামী, জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফকে ধরে নিয়ে যায়। সবাই ফেরত আসেন, আসেন না কেবল রুমী। শরীফ সাহেবের উপর চালানো হয় দৈহিক নির্যাতন।

(২০ নভেম্বর, শনিবার, ১৯৭১)
আজ ঈদ। রুমি নাই …আমি ভোরে উঠে সেমাই জর্দা রেঁধেছি।
…যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আসে এ বাড়ীতে। …তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওযাবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও কিনে লুকিয়ে রেখেছি।

(১৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, ১৯৭১)

(জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফ সাহেব হার্ট অ্যাটাকে হাসপাতালে কিন্ত ব্লাক আউট থাকায়, লাইফসেভিং মেশিন সময়মতো চালানো যায়নি। ১৮ ডিসেম্বর শরীফ সাহেবের মৃতদেহ বাসায় আনা হয়

(১৭ ডিসেম্বর, শুক্রবার, ১৯৭১)
আমি মেজর হায়দারকে বললাম, জামী পারিবারিক অসুবিধার কারণে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেনি। ও একেবারে পাগলা হয়ে আছে। ওকে কাজে লাগাও।
মেজর হায়দার জামীকে বললেন, …ভেবে দেখ, পারবে কি না। এটা খুব টাফ জব। চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি।
...


*কেবল বিশেষ বিশেষ অংশ উল্লেখ করা হল

No comments: